বঙ্গভঙ্গ থেকে নকশাল আন্দোলন, ১২০ পেরিয়েও কলকাতার সেরা কেক ঠিকানা নাহুমস

Nahoum and sons Bakery : কলকাতার কেক সাম্রাজ্যে এখনও স্বমহিমায় নাহুমস

কেক নিয়ে বাঙালির এক চিরন্তন ভালোবাসা। বছরভর যে কোনও উৎসবেই আজকাল জাঁকিয়ে বসেছে কেক। উৎসবের অভিনবত্ব যেন ওখানেই। আজকাল কেকের বাজারে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বাজারের নামজাদা দোকানের পাশাপাশি এখন বাড়ি বাড়ি কেক মেকিংয়ের হুজুগ। বাহারি সাজের কাস্টোমাইজ কেকে বাজার ছেয়েছে। কিন্তু সাবেকি স্বাদের নস্টালজিয়া আজও বাঙালিকে টেনে নিয়ে যায় শতাব্দী প্রাচীন আস্তানায়।

নাহুমস বেকারি। শহর কলকাতার বুকে টিকে থাকা সেকেলে কেকের ডেরা। সময়ের স্রোতে ঘষা লেগে আজও বাজার চলতি আধুনিকতায় পাল্লা দিচ্ছে নিয়ত। সেলেব্রিটি শেফ থেকে ফুড ব্লগার— কলকাতায় এলে একবার অন্তত এখানে পা পড়া চাই এ দোকানে। বাঙালির রসনা তৃপ্তির যে গোপন রসায়ন তাঁরা আয়ত্ত করেছেন তার শুরুটা হয় ১৯০২ সালে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর আগে। নাহুম ইজরায়েল মরদেকাই নামের এক ইহুদি তৈরি করেন এই বেকারির দোকান। উত্তরাধিকার সূত্রে এ দোকানের আজকের মালিক তাঁর নাতি ৮০ ঊর্ধ্ব আইজ্যাক নাহুমস। তিনিও এ দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন একেবারে ছোট বয়স থেকে। তাঁর দীর্ঘ ৬৮ বছরের সফরে কতো বদলই না দেখলেন কলকাতার সার্বিক কেক ব্যবসার। চোখের সামনে ইতিউতি গজিয়ে উঠতে দেখলে নামি বেনামী কতো কতো দোকানও কিন্তু তার জেরে নাহুমসের ব্যবসায় ঘাটতি পড়েনি একরত্তিও। আজও কলকাতার বিখ্যাত গলি হগ মার্কেটে রমরমিয়ে চলে নাহুম পরিবারের ব্যবসা। কলকাতায় টিকে থাকা শেষ ইহুদি কেকের দোকানও এটিই।

নাহুমস, নিউ মার্কেটের এই দোকানটি শহরের হেরিটেজের সঙ্গে একদম মিশে গেছে। অবশ্য শুরুতেই দোকান করতে পারেননি ইহুদি ব্যবসায়ী। শুরুর দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কেক, পেস্ট্রি বিক্রি করতেন তিনি। স্বাদের ঘরে যাতায়াতের শুরুটা হয় এভাবেই। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে নিউ মার্কেটে এক চিলতে দোকানঘরে শুরু হয় স্থায়ী ব্যবসা। তারপর থেকে বহুকিছু দেখেছে এ দোকান। প্রজন্মের হাত বদল হয়েছে কিন্তু আজও স্বমহিমায় হগ মার্কেটের ঘিঞ্জি এলাকায় টিকে রয়েছে নহুমস বেকারি।

আরও পড়ুন - সাধ্যের মধ্যে সাবেকি স্বাদ, ৯০ বছর পার করে এসেও যেভাবে বাঙালির প্রিয় ‘বড়ুয়া বেকারি’

কেক, প্যাটিস, বিস্কুট থেকে শুরু করে হাল আমলের কুকিস, মিলিয়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ রকমের মনকাড়া খাবারের সম্ভার রয়েছে এ দোকানে। যদিও এ দোকানের ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণ চকলেট, স্ট্রবেরি কেক কিংবা রাম বল। তবে শীতের সময় প্রধানত বড়দিন এবং নতুন বছরে ক্রেতাদের চোখের মণি হয়ে ওঠে রিচ ফ্রুট কেক। আধুনিকতার চাপে সারা বছর কেকের ব্যবসায় খানিকটা মন্দা গেলেও এই বড়দিনের ভিড়ে মানুষ ফিরে যায় সাবেকিয়ানার কাছেই। নানা রকম স্বাদের রিচ ফ্রুট কেকে মানুষের মন ভোলাতে এ দোকানের জুড়ি মেলা ভার। এছাড়াও শীতকালে আরও একটা জিনিসের চাহিদা তুঙ্গে থাকে, তা হল নাহুমস স্পেশাল পুডিং। বাইরের আবহাওয়ার সঙ্গে যেন ওই উষ্ণ পুডিংয়ের স্বাদ মিলেমিশে একটা অন্য রসায়ন তৈরি করে, জ্বর থেকে চাইলেও পালানো যায় না। তাছাড়াও বছরের অন্যান্য সময়ের জন্য তো রয়েছেই ব্রাটুনি, ব্ল্যাক ফরেস্ট, ক্রুজের মতো নানা কেক ও পেস্ট্রির সম্ভার। শুধু তাই নয়, প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে থেমে থাকেননি এঁরাও। যুগের সঙ্গে 5আল মিলিয়ে অভিনব কেকের ছোঁয়াচ লেগেছে শতাব্দী প্রাচীন দোকানেও। নতুন নতুন কেকের পাশাপাশি এসেছে নানা ধরনের বাজারচলতি বিস্কুট, কুকিসের রকমফের। কিন্তু তাও নস্টালজিয়া টিকে আছে ঐতিহ্যেই।


বঙ্গভঙ্গ, অসহযোগ, স্বাধীনতা, দেশভাগ, নকশাল, কত কত ওঠাপড়ার সাক্ষী থেকেছে এ দোকান। সাক্ষী থেকে যুগ বদলের। সবটুকুই নাহুমস আগলে রেখেছে বুকে করে। ১২০ টা বছর পেরিয়ে এসেও স্বপ্ন দেখছে আরও ১০০ বছরের। যেখানে হয়তো আরও বদলে যাবে এ শহরটা কিন্তু সে বদলের সঙ্গেও অষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতে থাকতে চায় ইহুদিরা। জড়িয়ে রাখতে চায় তাঁদের প্রিয় নাহুমসকেও।

More Articles