কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির প্রতিবাদ করতে ১৪ ঘণ্টা সময় কেন নিলেন মমতা?

Mamata Banerjee Arvind Kejriwal: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রতিবাদে ঢিলেমি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই নীরবতা আসলে কি 'সেটিং তত্ত্ব'-রই প্রমাণ নয়?

দিদির জন্মদিনে তিনি শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান, সুস্থ জীবনের কামনা করেন। দিদি মাথায় চোট পেয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটালে সঙ্গে সঙ্গে সুস্থতার কামনা করে টুইট করে জানান তিনি আছেন পাশে। রাজনৈতিক সৌহার্দ্য কাকে বলে টুইটে টুইটে প্রমাণ করেছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা আর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল জোট শরিকও। আসন ভাগাভাগির কোনও খেলাতেই মমতা নেই। অথচ তিনি ইন্ডিয়া জোটে কিন্তু খাতায় কলমে আছেন। আছেন অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। সেই কেজরিওয়ালকেই ইডি গ্রেফতার করেছে আবগারি নীতি কেলেঙ্কারিতে। দেশজুড়ে শোরগোল ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা। অথচ এই একটি ঘটনার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সময় নিলেন ১৪ ঘণ্টা! অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য এখনও! দোলা সেন, ডেরেক ও'ব্রায়েনের মতো কয়েকজন কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির বিরোধিতায় তড়িঘড়ি পোস্ট করেছেন ঠিকই, কিন্তু তৃণমূলের মুখেরা দীর্ঘক্ষণ চুপ রইলেন কেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রতিবাদে ঢিলেমি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই নীরবতা আসলে কি 'সেটিং তত্ত্ব'-রই প্রমাণ নয়? মমতা জানেন তাঁর দলের শাহজাহান থেকে শুরু করে পার্থ চট্টোপাধ্যায় সকলেই জেলে। অরূপ বিশ্বাস ও স্বরূপ বিশ্বাসের বাড়িতে তল্লাশি চলছে। এই অবস্থায় নীরবতা বা প্রতিবাদ করতে সময় নেওয়া প্রমাণ করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুর নরম করছেন ভেতরে ভেতরে। 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের রাজনৈতিক সম্পর্ক কিন্তু কখনই খারাপ ছিল না। সম্প্রতি পড়ে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা চোট পাওয়ার পরে কেজরিওয়াল টুইটে খোঁজ করেছিলেন। মমতা নিজে সেই টুইটের উত্তরও দেন। তাহলে ইডির কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির ঘটনায় সামান্য প্রতিবাদ করতে কেন এত সময় নিলেন মমতা? লোকসভা নির্বাচনের আগে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর গ্রেফতারির ঘটনা নিঃসন্দেহে সারা দেশের রাজনীতিতে এক বিশাল ঘটনা। কিছুকাল আগেই ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে গ্রেফতার করা হয়। তৃণমূলের একাধিক নেতাও জেলে। তৃণমূল বারবার বলে এসেছে ইডি-সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে বিজেপি রাজনৈতিক ফায়দা লোটে। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেফতারিতে কি ভয় বেড়েছে তৃণমূলের। এই চুপ থাকা, এই দীর্ঘ বিরতি নিয়ে আসলে নিজেদের বাঁচাতে চাইছেন মমতা?

 

আরও পড়ুন- অরবিন্দ কেজরিওয়াল গ্রেফতার! বিজেপির দিল্লি দখলের মোক্ষম অস্ত্র এটিই?

লোকসভা নির্বাচনে যতই সকলে ইন্ডিয়া জোটে থাকুন না কেন, কেজরিওয়াল আর মমতা একটি সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিলেন। মমতা স্পষ্ট বলেছিলেন রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও আসন ভাগাভাগি নয়। ওদিকে কেজরিওয়ালও বলে দেন পঞ্জাবে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, নিজের রাজ্যে বিজেপিকে ২০ টির বেশি আসন পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছে তৃণমূল। একাধিক আসনে বিজেপি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দুর্বলতম প্রার্থী দিয়ে, বেশ কিছু আসনে ভোট কাটাকাটির অঙ্কে বিজেপিকে বড় অংশ পাইয়ে দিতে চেয়েছে তৃণমূল। এই 'সেটিং'-এর কারণেই একা লড়তে চেয়েছে তৃণমূল। যাতে নিজের গড় ধরে রাখা যায় আর দলের দুর্নীতির মাথাদেরও ইডি-সিবিআই অস্ত্র থেকে রক্ষাকবচ জোগানো যায়। তাই কেজরিওয়ালের গ্রেফতারির তেড়েফুঁড়ে বিরোধিতা করলে আখেরে তৃণমূলের সামনের সারির নেতাদেরই বিপদ হতো। তাই নরম স্ট্রোক খেলে আদতে একদিকে বিজেপির মনরক্ষা করতে চাইছে তৃণমূল, অন্যদিকে ইন্ডিয়া জোটকেও বলতে চাইছে 'পাশে আছি'।

কেজরিওয়ালের গ্রেফতারিকে ‘লজ্জাজনক ও অসাংবিধানিক’ বলেছেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গান্ধি বঢ়রা। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন, এনসিপি প্রধান শরদ পওয়ার, সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি, এসপি প্রধান অখিলেশ যাদব এর নিন্দা করেছেন। বাংলায় বিজেপির রাজ্যসভাপতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, মাফলারের পর হাওয়াই চটি। এই ইঙ্গিত যে আসলে খানিক ফাঁপা তা নানা তথ্য দিয়ে প্রমাণ করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। এই লোকসভা নির্বাচনে জান লড়িয়ে দেবেই তৃণমূল। তার জন্য যেখানে যেভাবে আচরণ করতে হয় তাতে প্রস্তুত ঘাসফুল শিবির। দলের একাধিক নেতা-মন্ত্রী নানা দুর্নীতিতে জেলে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ রইলেও তিনিই একমাত্র এখনও ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলতে পেরেছেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছে, কয়লা পাচার মামলায় ১০ জুলাই পর্যন্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জেরার জন্য দিল্লিতে তলব করবে না ইডি। স্বাভাবিকভাবেই, আদালতের এই নির্দেশ তৃণমূলের জন্য বিরাট এক অর্জন!

লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে অভিষেক ব্যস্ত থাকবেন। ফলে তাঁকে দিল্লিতে তলব করা যাবে না। ১০ জুলাই মানে ভোট শেষ, ভোট গণনা শেষ, ফলাফল জেনে সরকার গড়াও শেষ। ততদিন অবধি অভিষেককে ছুঁতেও পারবে না ইডি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিষেককে বাঁচানোর এই ব্যবস্থাটি বিজেপির অসম্মতিতে হয়নি মোটেও। তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যেকার বোঝাপড়াতেই অভিষেক বাড়তি সময় পেয়েছেন। নির্বিঘ্নে রাজ্যে প্রচার করার সুযোগ পেয়েছেন। সবটাই বিজেপির আনুকূল্যে। তাই এই মুহূর্তে অরবিন্দের পাশেও থাকব আবার বিজেপি বিরোধিতার সুরেও হালকা গেয়ে চলব পথেই আস্থা রাখছে তৃণমূল। এখনও ভোট হয়নি, ফলাফলও তাই জানা নেই। এদিকে বিজেপির আগ্রাসনের সামনে বিস্তর দুর্নীতির বোঝা নিয়ে নির্ভীকও থাকা যাচ্ছে না। তাই নরমপন্থাতে ভরসা রেখেই এগোচ্ছে তৃণমূল।

More Articles